ওরশ শরিফ

সম্মানিত সুধী!
আস্সালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ!
সততা, পরিশ্রম, পরোপকার, মানবসেবা, পরমত সহিষ্ণুতা, অধ্যাবসায়, দ্বীন-মাজহাব তথা সুন্নিয়তের নিরলস খেদমত করে জীবনে জনপ্রিয় হয়েছেন আল্লামা ছালেহ জহুর ওয়াজেদী (রহ.)। তাঁর জানাযার মাঠে হাজার হাজার মুসল্লিদের সমাগম এ কথার বাস্তবতা সাক্ষ্য দেয়। বরেন্য এ আলেমে দ্বীন মদিনাতুল আউলিয়া খ্যাত চট্টগ্রাম নগরীর ওয়াজেদীয়া এলাকায় ১৯৪০ সালে ধরণীকে আলোকিত করে জন্ম গ্রহণ করেন। সদা হাস্যোজ্জ্বল, বিনয়ী, উদার, সহনশীল ও মানবিক গুণাবলিতে পরিপূর্ণ হুজুর ছিলেন একাধারে আলেমে দ্বীন, আমিরুল হুজ্জাজ, শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক। যার পুরো জীবন হাজীদের খেদমতে এবং দুস্থ-অসহায় মানুষের কল্যাণে নিবেদিত ছিল। তিনি সর্বপ্রথম হজ্ব পালন করেন ১৯৭৪ সালে। অতপর তাঁর সততা, ন্যায়পরায়ণতা, বিশ্বস্ততা, এলমে দ্বীন তথা ধর্মীয় জ্ঞান বিতরণে তাঁর প্রজ্ঞা দেখে বাংলাদেশ সরকার প্রীত হয়ে তাঁকে ১৯৭৮-৭৯ সনে শহীদ সালাউদ্দীন নামক পানির জাহাজে করে যাওয়া বাংলাদেশী হজ্ব যাত্রীদের চীফ কো-অর্ডিনেটর বা প্রধান সমন্বয়ক তথা আমিরুল হুজ্জাজের দায়িত্ব দিয়ে সৌদি আরব পাঠান। উল্লেখ্য, আজ থেকে ৪৫-৫০ বছর আগে বিমান যোগে হজ্বে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম পানির জাহাজে করে ৩/৪ হাজার হাজ্বীর গ্র“প লিডার তথা আমিরুল হুজ্জাজ হিসেবে অত্যন্ত সম্মান ও মর্যদাকর দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ৭৮ বছর হায়াতে তিনি ৪০/৪২ বারের মতো পবিত্র হজ্ব-ওমরাহ পালন করেন। সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি হাজ্বীদের সেবায় বাংলাদেশের অনন্য মডেল এ মহান ব্যক্তি বৃহত্তর পরিসরে আল্লাহর মেহমানদের আরো বেশি খেদমত করার লক্ষে চট্টগ্রামে ১৯৯৬ সালে বেসরকারিভাবে প্রতিষ্ঠা করেন ‘শাহ্ আমানত হজ্ব কাফেলা’। প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে আমৃত্যু চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে তিনি এ কাফেলাকে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ হজ্ব কাফেলায় পরিণত করেন। সাথে সাথে তাঁর পাঁচ সন্তানকেও হাজ্বীদের সেবায় উৎসর্গ করার মানসে তাদেরকে উপযুক্ত করে গড়ে তোলেন। তিনি জীবিত অবস্থায় তাঁর ৫ ছেলে ও ৬ মেয়ের বিবাহ সম্পন্ন করে গেছেন। এমনকি বড় ছেলের মেয়ে তথা নাতনির বিয়ে দেখে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে তাঁর। সে হিসেবে তিনি একজন সফল মানুষ। তিনি ইমামে আহলে সুন্নাত, গাজীয়ে দ্বীনো মিল্লাত, আল্লামা সৈয়দ আজিজুল হক আলকাদেরী তথা শেরে বাংলা (রহ.) এর ইন্তেকালের পর অধ্যক্ষ আল্লামা জাফর আহমদ সিদ্দিকি (রহ.) সহ কয়েকজন বরেণ্য আলেমদেরকে নিয়ে মাঠে-ময়দানে সুন্নিয়তের হাল ধরেছিলেন। তিনি বিভিন্ন জায়গায় মাহফিলে সুন্নিদের কথা উচ্চ কণ্ঠে তুলে ধরতেন। বিশেষ করে চট্টগ্রামের হাটহাজারী এলাকা এবং নৌকায় করে কালুরঘাট দিয়ে বোয়ালখালী, কধুরখীল, মোহরা, চন্দনাইশসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় মাহফিলে যেতেন। হুজুরের একটি বড় আদর্শ ছিল, মাহফিলের হাদিয়া হিসেবে ছাহেবে দাওয়াত হুজুরকে কতো টাকা দিয়েছে কোনো দিন তা খুলে দেখেননি। হাজ্বীদের সেবায় আমৃত্যু কাজ করে যাওয়া হুজুর প্রায়ই বলতেন আমি ইন্তেকালের আগমুহূর্ত পর্যন্ত হাজ্বীদের সেবা করে যাবো। হাজ্বীদের সেবা করলে দুনিয়া ও আখেরাত দুটিই পাওয়া যাবে। দুনিয়ার সুখ-শান্তি, বিশ্রাম আমার দরকার নেই। আমার প্রতিষ্ঠিত শাহ আমানত হজ্ব কাফেলা একদিন দেশের সেরা কাফেলার মর্যাদা লাভ করবে ইনশা-আল্লাহ। আমার সব সন্তানকে আমি হাজীদের খেদমতে নিয়োজিত রাখবো এটাই আমার ইচ্ছা। আর এখন আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেছেন। হুজুরের অসংখ্য কেরামতের মধ্যে কয়েকটি হল ২০১৭ সালের হজ্ব নিবন্ধন চলাকালীন সময়ে একরাত্রে হুজুর আল্লামা ছালেহ জহুর ওয়াজেদী (রহ) ওনার ভাতিজা ইউসুফকে ডেকে বলতেছিলেন ‘ওবা ইউসুফ’ ইয়াছিন (বড় ছেলে কাফেলার এমডি) কোথায়? তাকে বল এই বছর ২৭২ জন হাজীর নিবন্ধন হবে না। এগুলো আটকে থাকবে, তাকে বল (ইয়াছিন) সিলেট হযরত শাহ জালাল (রা.) ও শাহ পরানের (রা.) মাজারে গিয়ে সেখানে যিয়ারত ও গরিব-মিসকিনকে খাদ্য খাওয়াতে এবং যিয়ারত শেষে ওই দুই মহান ওলীর ওসিলায় আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানাতে। এতে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে ও নিবন্ধন হয়ে যাবে ইনশা-আল্লাহ। ইউসুফ এ কথা বলার পর আলহাজ্ব মুহাম্মদ ইয়াছিন অফিসে বসে হিসাব করে দেখলেন, ঠিকই ১৬০০ হাজ্বীর মধ্যে ২৭২ জনের নিবন্ধন হয়নি। অথচ সময় আছে একদিন। পরে শাহ জালাল (রা.) ও শাহ পরানের (রা.) মাজারে যিয়ারত করার পর আল্লাহর মেহেরবাণী ও হুজুরের দোয়ায় ঐ দিনই ২৭২ জনের নিবন্ধন হয়ে গেল। এতে ১৬০০ জন হাজ্বীর পরিপূর্ণ কাফেলা নিয়ে হজ্ব পালন করতে সক্ষম হয় শাহ আমানত হজ্ব কাফেলা। আরেকটি অনন্য কারামত হল, হুজুর ইন্তেকালের ১০ দিন পূর্বে মুরাদপুরস্থ ‘শাহ আমানত হজ্ব কাফেলার’ নতুন ডেকোরেশন করা অফিসে এসে দোয়া-মুনাজাতের পর অধ্যক্ষ আল্লামা নুরুল মুনাওয়ার ও মাওলানা সৈয়দ মফজল আহমদ এই দু’জনের সামনে বললেন, আজকেই আমার এই অফিসে শেষ আসা, এরপর থেকে আমি আর আসতে পারবোনা। একজন মানুষ বুজুর্গ হওয়ার জন্য এর চেয়ে বড় দলিল আর কি হতে পারে? যিনি তার ইন্তেকালের পূর্বে ইন্তেকালের খবর বলতে পারেন। হুজুরের ইন্তেকালও এমন সময়ে হয়েছে যখন হজ্ব কাফেলার কাজ তথা চাপ কম। শুধু তাই নয় তার ৫ ছেলে ও ৬ মেয়েসহ আত্মীয়-স্বজন, ভক্ত, শুভাকাঙ্খীসহ হাজার হাজার মুসল্লি উপস্থিত ছিলেন। যদি জিলহজ্ব মাসে উনার ইন্তেকাল হত তাহলে ওনার ছেলেরাই থাকতেন মক্কা কিংবা মদিনায়। স্মরণীয় যে, বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরীর যে স্থানে হুজুরের মাজার শরিফ রয়েছে সে ওয়াজেদীয়া জায়গাটি ছিল একসময় জনমানবহীন, অবহেলিত, অনুন্নত এলাকা; এমনকি দিনের বেলায়ও সেদিকে মানুষ তেমন একটা যেত না। অথচ আল্লাহর অলিদের কি রহস্য! কি কেরামত!! আল্লামা ছালেহ জহুর ওয়াজেদী (রহ.) এর মত একজন বরেণ্য আলেমে দ্বীনের ছোঁয়ায় এটি এখন নগরীর সবচেয়ে দামী এলাকা। সেটি আজ মানুষের পদচারণায় মুখরিত। এ ক্ষেত্রে আমরা প্রাচীন চাঁটগার অলি-বুজুর্গ হযরত শাহ্ আমানত ও হযরত বদর আউলিয়া (রা.) সহ অন্যান্য অলিদের অবদান কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি, যাদের হাতের ছোঁয়ায় একসময়ের জনমানবহীন চাটগাঁ শহর এখন জনাকীর্ণ। আমরা আশাকরি অদূর ভবিষ্যতে এ এলাকা ও মাজার সংলগ্ন সড়কটি হবে আন্ত:জেলা ও আন্ত:দেশীয় মহাসড়ক। তার প্রাথমিক সূচনা এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি। এটি এখন ভক্ত জায়েরীনদেন জেয়ারত ও পদচারণায় মুখরিত। বর্ণাঢ্য জীবনে বহুমাত্রিক গুণ-বৈশিষ্ট্যের অধিকারী এ বুজূর্গের মাজারে প্রতিদিন প্রতি ওয়াক্ত নামাজান্তে যেয়ারতসহ প্রতি বৃহস্পতিবার বাদে এশা সাপ্তাহিক মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া প্রতি মাসের শেষ বৃহস্পতিবার বাদে এশা আটশত থেকে এক হাজার লোকের খাবারের ব্যবস্থাসহ মাসিক মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশের বরেণ্য আলেমেদ্বীনগণ উপস্থিত থেকে দ্বীন, শরিয়ত, তরিকত ও মাসয়ালা-মাসায়েল সম্পর্কে আলোচনা করেন। এ মহান বুজূর্গ ১৪ জানুয়ারী ২০১৭ ঈসায়ী শনিবার শেষ রাতে মাওলায়ে হাকীকির সাক্ষাত লাভে ধন্য হন। তাঁর মাজার শরিফকে ঘিরে একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী কমপ্লেক্স গড়ার কাজ এগিয়ে চলছে। তাঁর ১ম বার্ষিক ওরশ শরীফ উপলক্ষে দু’দিনব্যাপী ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এ মহতি মাহফিলে সুন্নি পীর-মশায়েখ, দেশ-বিদেশের বরেণ্য আলেমে-দ্বীন, মন্ত্রী-মেয়রসহ উচ্চপদস্থ সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাবৃন্দ, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, ইসলামী চিন্তাবিদ, শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবি ও সাংবাদিকবৃন্দ উপস্থিত থাকবেন। আসুন এ মহান বুজূর্গের ওরশ শরিফে উপস্থিত হয়ে আল্লাহ ও রাসূলের (দ.) রেজামন্দি হাসিল করি।

আরজগুজার
সাজ্জাদানশীন, বড় ছাহেবজাদা আমিরুল হুজ্জাজ
আলহাজ্ব মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াছিন
চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকশাহ আমানত হজ্ব কাফেলা। মোবাইল: ০১৮১৯-৩৮১৩৯৫